সিতাংশু গোস্বামীর কবিতা
ধর্মযাজক কবি সিতাংশু গোস্বামীর জন্ম ২ এপ্রিল ১৯৫৫ । কবির প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। তাঁর প্রকাশিত কবিতার বইগুলি হল কতদূর সমুদ্র মন্থন (১৯৭৯) , প্রিয় পরাজয় (১৯৮৫), অসম্ভব ধুলোবালি (১৯৯২), একটা বদল আয় (১৯৯৫), ভ্রান্তির খড়কুটো (১৯৯৮), ঠাকুর গোপাল ওঠো (২০০৫), সফেদ শাঁখের কণ্ঠ (২০১০), মধু মাসে বেদে নাচ (২০১৩), জাগর গান গাও (২০১৬), তবু সনাতন (২০১৮), ছন্দের পতন (২০২১) ।
কবির সম্পাদিত পত্রিকা "স্তবক" (১৯৭৬-৮২) । ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতিবছর প্রদান করে আসছেন "কবি গোপাল ভৌমিক স্মৃতি পুরস্কার"। পাশাপাশি তিনি পেয়েছেন চিন্ময় হালদার স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ১৯৯৪ , এবং বিপিন বিহারী সরকার স্মৃতি পানসি পুরস্কার ২০১৫ ।
সিতাংশু গোস্বামীর কবিতা
খবরে প্রকাশ
খবরে প্রকাশ, বসন্ত নাকি দাঁড়িয়ে আছে
ঠায় আমাদের দোর-গোরায় এসে
ধরা পড়ে পাঁজির মাপা-জোখা ছকের হিসেবে
জানান দেয় চত্তিরের পড়তি বিকেল
কোকিল ডেকে ডেকে ফিরে গেছে সেই কবে
গোপন কাগজ বিলি করা যুবকের মতো
টেরই পাইনি একেবারে
আম-মুকুলের মধু খালি নষ্ট করে গুটি।
ছেঁড়া কাগজ
ছেঁড়া কাগজ জুড়তে কি কেউ পারে?
কেবল পারে ঐন্দ্রজালিক।
ঐন্দ্রজালিক জানে,
চট্ জলদি হাতের চেটোয় লুকিয়ে নিতে
ছিন্ন কাগজ মালা।
যেমন সব দুঃখ আমার গোপন রাখি
বকফুলের পাতার ভাঁজে, অন্ধকারে।
ছেঁড়া কাগজ জুড়তে কি কেউ পারে?
জন্ম মার ছেঁড়া কাগজ!
ঋণ
আকাশের নীচে ওরা শুয়েছে কাঁটার শয্যা পেতে
ইচ্ছা মৃত্যু বুকে নিয়ে পতঙ্গেরা স্বপ্ন নষ্ট ক'রে
অমোঘ সাধের হাতে তুলে দেয় অবসন্ন ঋণ।
হলুদ অড়র ফুলে অনিবার ব্যথার বিস্ময়
লুকিয়ে রেখেছে তার সকল স্বাক্ষর কুয়াশায়।
নিয়রের জলে ভেজে সকালের পালতে মাদার।
গাঢ় নীল পিপুলটি নিয়ত গোপন আন্দোলনে
নিজের প্রচ্ছদ ছিঁড়ে চেয়েছিল আসঙ্গ বাতাস ;
ফসলের গুমো গন্ধ স্থির তবু প্রকাশ্য চাতালে
অরণ্য প্রস্তুত অরণি
বনের জঠরে শিকড়ে শিকড়ে নিবিড় হরিৎ গন্ধ
সুপ্ত মোহন অনির্বচন বেদনায় করে উতলা;
পূর্ণ মদির বনানী অধীর ঝ'রে পড়ে মকরন্দ,
আফলা ঋতুতে মেঘে ঢাকা শীতে মায়ালু গহন নিরালা।
শুশ্রূষাহীন বিবর্ণ দিন ছায়ায় ছায়ায় আর্ত,
বনজ ব্যথায় আহত পাতায় ভীরু বিহবল বনানী।
উদাসী শিথিল হাওয়ায় নিখিল ভুবন হয়েছে ক্লান্ত,
শূন্য মহিমা জড়িয়েছে সীমা তবু প্রস্তুত অরণি।।
জীবিকা
তাই তাই তাই তাই
জীবিকা নেই তাই--
উপজীবিকাই
জীবিকা হোক,চাই।
আদ্যিকালের বিদ্যে
গুরুমারা বিদ্যে--
আর কিছু তো নাই।
আর তো কিছু নাই।
তাই তাই তাই তাই
জীবিকা নেই তাই--
উপজীবিকাই
জীবিকা হোক,চাই।
উজানের হাওয়া
সোহাগের জলে ওরা দিয়ে গেছে উজানের হাওয়া
উল্টোস্রোতে সেই হাওয়া ঘুরে ঘুরে ঘুরে ঘুরে ঘুরে
দূরে - আরও বহুদূরে- নিয়ে গেছে নিটোল ঝিনুক
দোহার বুকেতে রেখে জলে ভিজে স্বাতী তারকার
ভিজে ভিজে তবুও যে বড় একা, অথচ মিথুন
দৃষ্টিপ্রদীপের আলো তাই আজ ফিকে হয়ে যায়
শুক্তির গভীরে কবে তৈরি হবে মুক্তা নামে ভ্রুণ!
নষ্ট হরফ
শ্লোক ভেঙে গেছে, নষ্ট হরফ উঠে আসে কবিতায়
বিবিক্ত ধান-দূর্বা গড়ায়, হয়েছে শাপের বলি
পিউ কাঁহা পাখি গলা চিরে ডেকে ভ'রে তোলে চরাচর
গঙ্গার জল ধ'রে রাখা দায় দু'মুঠোর আঁজলায়....
শূন্য হাতের পূর্ণতা আনে ব্যর্থ লাজাঞ্জলি
কলার ভেলায় ভেসে যাবে তবে একাকী লখীন্দর?
কোথায় দাঁড়ালে এসে
কোথায় দাঁড়ালে এসে, ও গোসাঁই! ঘোরো কার নিয়ত সন্ধানে!
চেয়ে দ্যাখো চৌর্যবৃত্তি __ অপহৃত খাদ্য-বস্ত্র__আরও কত ধন;
বাঁশরী নিয়েছে চোরে, কেউ কি মিলিয়ে দেবে অমূল্য রতন?
সকলেই আছে, তবু মনে হয় কেউ নেই অন্ধকার স্থানে।
দিবাকল্পে রাত্রিকল্প গোপনে বাড়ায় হাত নি নির্ঋতির টানে।
সিঁধকাঠি সিঁধ কাটে, চুপিসারে নিয়ে যায় পূত আচমন;
শূন্য ধ'রে বেঁচে থাকা,শূন্য নিয়ে হেঁটে চলা, শূন্য ভদ্রাসন।
দ্যুলোকের কন্যা! তুমি গণদেবতাকে দাও মন্ত্র কানে কানে।
নামরূপই সত্য
নামহীন নাম খালি নিত্যকাল নামরূপে ঘোরে।
তুমি তবে কাকে খোঁজো! খোঁজো কাকে! কাকে খোঁজো, বলো!
বলো নাম, নাম বলো! ঢেউ - ঢেউ - ঢেউয়ের ছলাৎ...
নামরূপই সত্য তাও, নামেরই আড়ালে থাকো তুমি।
মূর্ত হোক দেখা
বোবারা গীত গায় মিথ্যে ইশারায়
যায় না সব বোঝা।
কালারা সেই গান শুনছে পেতে কান
অর্থ চলে খোঁজা...
প্রগতি গতি আনে, তারই কি সন্ধানে
মধুরও পাওয়া যায়?
সাক্ষী রেখে তাকে জীবন ছবি আঁকে,
কারা তা ধ্যাবড়ায়!
নষ্ট রূপ নিয়ে পথিক পথ দিয়ে
হাঁটছে একা একা।
অধরচাঁদ! এসো, মৌন মীড়ে মেশো;
মূর্ত হোক দেখা।
পৃথিবী অসুস্থ বড়
পৃথিবী অসুস্থ বড়, রোগমুক্তি ঘটুক এখন;
প্রাণ যে সবারই এক__বিশ্ব ক'রে রেখেছে ধারণ।
প্রকৃতি চালিত করে চিরন্তন মানব সমাজ,
তথাপি তাকিয়ে দেখো, সেই তো শাসিত হচ্ছে আজ।
সেই শাসনের হেতু এসেছে মারণ এক ব্যাধি,
শুদ্ধ হও, হও শুদ্ধ __সবই ঠিক হয় নিরবধি।
সত্ত্ব রজ তম__ এ যে ত্রিগুণের আধার-আধান,
সৃষ্টির সড়কে কাঁটা, তুলে ফেলে বাঁচাও সন্তান।
অসুখ বালাই, এসে যাবে টিকা__ হ'ল যে ঘোষণ;
ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি রাখো উচ্চারণ....
কনক অঞ্জলি
কনক অঞ্জলি রেখে চলে যায় বাংলার দুলালী,
ধুতি-খুঁটে ধরা থাকে সে এক বেদনা মাখা কথা
'যাবো না তোমাকে ছেড়ে, তোমাকে যাবো না ছেড়ে বাবা।'
তবু সব দিয়ে থুয়ে একা ঘোরে ঋণ শোধ ব্যথা।
এ ব্যথা বোঝে কি কেউ? কাকে তা'লে শোনাও গিরীশ!
এদিকে বলো যে তুমি-- 'কাঁদে না, কাঁদে না খালি খালি;'
অন্যধারে নিজে কেন গোপনে চোখের জল ফেলো?
শুভ কাজে অশ্রু নয়--- দূরে রও শূন্য করতালি।
শূন্য খাঁচা বুকে নাও-'পাখি! ফের তুই ফিরে আয়।'
সারাটা জীবন যাবে চিরায়ত এই সাধনায়!
__________________________________________
সম্পাদক : কনিকা পাল
কবিতা পাঠানোর জন্য হোয়াটসঅ্যাপ করুন ৯৭৪৯১৬২১৭৫
Comments
Post a Comment