আবির গোস্বামীর কবিতা
কবি আবির গোস্বামীর ( জন্ম ১৯৮৩ সালে ) এ যাবৎ প্রকাশিত কবির কবিতার বইগুলি হল "শ্বাপদ ও বৃষ্টি", "শব্দ বরাবর", " পুৎনরক" । বর্তমানে তিনি শিক্ষকতার সাথে যুক্ত। পাশাপাশি কবিতা, গল্প, কবিতাবিষয়ক আলোচনাসহ বিভিন্ন লেখাও চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে পেশাদার কবি নন, তরুণ কবি বলাই ভালো। তিনি কয়েকজন নামী কবির সান্নিধ্যও পেয়েছেন।
পড়তে ভালোবাসেন দেবদাস আচার্য ফল্গু বসু মণীন্দ্র গুপ্ত আলোক সরকার সহ সত্তরের বহু কবির কবিতা। সম্পাদনা করেছেন "ত্রৈমাসিক আলেখ্য" নামে একটি ছোটো পত্রিকাও। শেষ পর্যন্ত অনিয়মিত ভাবে হলেও ভালো কবিতা ছাপার চেষ্টা করতেন।
'পুৎনরক' কবিতার বইয়ের জন্য সম্মানিত হয়েছেন "কবি গোপাল ভৌমিক স্মৃতি পুরস্কার"-এ । তার বেশির ভাগ কবিতা ছাপা হয়েছে বিভিন্ন ছোটো পত্রিকায়।
কবির বসবাস : নিরঞ্জন নগর , বীরনগর, নদীয়া
কাদা
একটি নিরীহ আলো এসে
এক দঙ্গল ধুলোর ষড়যন্ত্র ফাঁস করার পর
তারা দেয়ালের চোখে পিচুটি হয়ে বসেছে ।
অগত্যা আমাকে ঘরের চাল ফুঁড়ে
মেঘ ডেকে আনতে হল ।
টোপ
আমাদের অপেক্ষাও এক মায়াজাল বিস্তীর্ণ
নড়বড়ে হাতের খোদলে হিসেবের কবর
আকাশের দিকে ঘুরিয়ে রাখা দিকনির্দেশক চাকতি
উপরে তাকিয়ে দেখি মেয়াদ উত্তীর্ণ অমৃতের কলসি
ঠোঁটে নিয়ে নেমে আসছে একটা জারজ পাখি
নীচে তাকিয়ে দেখি অগস্ত্য যাত্রায় আমার সঙ্গে কেউ নেই ।
ঝোপ
জীবনের সঙ্গে ছক্কাপাঞ্জা খেলতে গিয়ে
সীমানাগুলো বেলেল্লা হয়ে পড়েছে
যেখানেই পা ফেলছি লাভা বেরিয়ে আসছে
প্রজাপতিরা কীভাবে বুঝল লাভাই ফুল হয় ?
শেষে তাদের পাখনা কেটে না নিলে আর
নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা পেতাম না ।
জীবন্ত খোলস
গোয়াল ঘরের পেছনে যেখানে খড় গাদা করা থাকত
ঐখানে শৈশব ফেলে এসেছি খড়গুলোও গেছে কোন চুলোয়
ছেলেবেলার সেই বইখাতা, কলম, চটি, জামাকাপড়
একটাও রেখে দাওনি মা । কেন রেখে দাওনি ?
আমার মরুভূমিতে এক চিলতে মরুদ্যান সেগুলো ।
তার পরিবর্তে ছড়িয়ে পড়ে আছে প্রথম কৈশোরের রেত
ক্লাসে অনুত্তীর্ণ হবার মার্কসিট, বাবার মারের চেলাকাঠ
আমার প্রথম শ্লীলতাহানির হাতিয়ার আমার সুইসাইড নোট ।
বর্ণমালা
ডাক্তারবাবু বলেছেন
বর্ণমালা ভুলে যাওয়া একরকম রোগ
যখন কেঁচেগণ্ডূষ করতে গেলাম,
'আ' হয়ে উঠল আমার 'আজন্ম'
'অ' দাঁড়াল আমার 'অভিশাপ' ।
ফলত 'ই' হয়ে ওঠে 'ইচ্ছামৃত্যু',
যার মতো গোলমেলে শব্দ পৃথিবীতে নেই ।
তখন কি আর বর্ণমালা ভালো লাগে ?
তার চেয়ে চলো মেঘের প্রচ্ছদ পেড়ে আনি ।
এঁকে দিই প্রত্নকালের বিবর্ণ এক জঙ্গল
উপোস ভাঙার পরে শিকারের ষড়যন্ত্র
জোনাকির আলো গেঁথে ঘর সাজানোর খেলা ।
ষড়যন্ত্র
দুটো কাক
একটা শকুনের অন্ত্রের
শুরু ও শেষ কামড়ে
বিপরীত দিকে দৌড় দিল ।
অন্ত্রের ভেতর থেকে
ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ল
একটা এ.টি.এম. কার্ড
প্রোমোটারের কাটা হাত
একটা আনকোরা দলিল
কতগুলো ব্যানারের আদ্যক্ষর ।
পর্বতের জন্ম
পা হারিয়ে গেছে আমাদের
যষ্টির দিকে তাকিয়ে বলি, তুমি
মরোনি কেন ঘূণপোকা ?
তোদের সঙ্গে যদি বাণপ্রস্থে যাই,
এক-আধলা রৌদ্রভূক পাথর ধরাবি ।
আমরা গুহামানবীর মতো সেই
পাথর ধরাব গুহামানবদের হাতে ।
তারা জঠরের আগুনে তরল করে
পাথরের ক্লেদ দেবে আমাদের গর্ভে ।
উৎসব নামবে আমাদের শরীর জুড়ে
পাথরের নিষেক পতাকার মতো কাঁপছে ।
প্রসব হতেই আকাশ ফুঁড়ে উঠবে মাথা ।
ক্রুশ
যে পুরাতন হাত চোখের আলোয় স্বপ্ন ঢেলে দেয়
তার সামনে সারি সারি ক্রুশ
কাঠখড় জ্বালিয়ে কুয়াশার গন্ধ তাড়ানো শেষ
ফুলদানির পাগুলো মাটিতে দেবে গেছে
দাবানলের আড়ালে চাঁদ ও কোকিল
রোমান সৈনিকের মতো দাঁড়িয়ে আছে বাঁশবন ।
শ্বাস
ফিরে এসো বারান্দায় রেডিওতে স্বর্ণযুগের গান
মেয়েকে নাচের স্কুলে ছেড়ে দিয়ে সুব্রতর বাড়িতে চা-আলাপ
ভ্রমর আর উড়োজাহাজর শব্দের মিল খুঁজতে কত নষ্ট সময়
খেয়াল করিনি স্কুলজীবনের পাখিরা এখনও বেঁচে আছে
ওদের ডাক বুঝিয়ে দেয় পৃথিবীটা ছোটো নয়
মানুষের ভেতরের কোটরে মৃত্যুর হাত পৌঁছয় না ।
আমি স্বীকার করি মৃত্যু নয়, মৃত্যুর ভয়কেই ভয় করি ।
রাজতন্ত্র
দরজা খুলে দেখি রাজার পেয়াদা এসেছে
তার পেছনে আমাদের হারানো ধানের গোলা
যে শিশু আর তার মাকে আগুনে ফেলে দেওয়া হয়েছিল
মুখ ঢেকে লুটিয়ে পড়া মায়ের হারানো সম্মান
ধান কেড়ে নেওয়ার সময় খুন হওয়া ইঁদুর
আমার পূর্ব পুরুষের থেকে কেড়ে নেওয়া যৌবন
আর সবশেষে নিজের পোষাকে স্বয়ং মহারাজা ।
পেয়াদা আমার হাতে চাবুক ধরিয়ে দিয়ে
রাজার শরীর থেকে পোষাক খুলে ফেলতে বলল ।
সম্পাদিকা : কনিকা পাল
আলাপ : ৯৭৪৯১৬২১৭৫ (হোয়াটসঅ্যাপ)
Comments
Post a Comment